নিজস্ব প্রতিবেদক:
সবার জীবনেই কমবেশি ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে কোনো গুরুত্বর অপরাধ যা মানুষের বিবেককে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, তেমন কিছুই কখনো স্পর্শ করিনি একজন মানুষ হিসেবে।
কাউকে হত্যা করা, নির্যাতন করা, জমি দখল কিংবা সন্ত্রাসী কায়দায় জীবন গড়ে তোলার মতো কোনো কর্মকান্ডের সঙ্গেই কখনোই কোনো সম্পৃক্ততা ছিলাম না, অথচ মুখোমুখি হওয়ার পথেই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্মম এক মিথ্যা অপবাদ।
ছোটবেলা থেকেই আমার প্রধান ঝোঁক ছিল লেখাপড়া ও ফুটবল খেলায়। ১৯৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা মাঠ কাঁপিয়েছি, খেলেছি ডিভিশন পর্যায় এমনকি বিদেশের মাটিতেও। আজও ৫৪ বছর বয়সে অনেকেই আমাকে নিজ এলাকায় সাবেক ফুটবলার হিসেবে চেনেন। বাবা-মায়ের স্নেহে বড় হওয়া শৈশব থেকেই পরিবার শিক্ষা পেয়েছি ‘জীবনে কখনো কারও ক্ষতি করি না।’ বাবা প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে আমার চাহিদা মিটিয়েছেন, কিন্তু অসৎ পথে যেতে দেননি।
অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমাকে বহন করতে হয়েছে ভয়াবহ এক মিথ্যা অপবাদ, আমি নাকি ছাত্র হত্যা করেছি! যে হাতে জীবনের একটি বড় সময় ফুটবল ছিল এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকতার কলম উঠেছে, সেই হাতে নাকি ছিল আগ্নেয়াস্ত্র!
ঘটনাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ী মেট্রো থানাধীন কাশিমপুর রোড এলাকায় টাঙ্গাইলের গোপালপুরের ‘হৃদয়’ নামের এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও যা ছড়িয়ে আছে সেই ভিডিওসহ নানা প্রমাণ, মৃত্যুটি ঘটেছিল পুলিশের গুলিতে। কিন্তু পূর্বশত্রুতার জেরে কণ্ঠরোধ করার হীন উদ্দেশ্যে ওই হত্যা মামলায় আমাকেসহ চারজন সাংবাদিক এবং আরও প্রায় দেড় শতাধিক নিরপরাধ মানুষকে আসামি করা হয়। অথচ ঘটনার তিন দিন আগে থেকেই আমি ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলাম না।
একজন সাংবাদিক হিসেবে যিনি সবসময় সমাজ ও দেশের মানুষের পক্ষে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করি, অথচ আমাকেই বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল হত্যা মামলার আসামি। শুরু হলো চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিন। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ বিশ্বাস হারায়নি কখনো। মনে মনে একটাই জোর ছিল ‘রাখে আল্লাহ, মারে কে!’ আমি কখনো আতঙ্ক থাকিনি। এও জানি যে, মেঘ শুধু কিছু সময়ের জন্য আকাশ ঢেকে রাখে।
অবশেষে দীর্ঘ সংকটের মেঘ কাটতে শুরু করেছে। মামলাটি বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলমান থাকলেও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমাদের চার সাংবাদিকসহ সকল নিরপরাধ ব্যক্তিদের এ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সত্য উন্মোচনের পর কারও প্রতি ক্ষোভ নেই তাঁর। তবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, “অন্যায়ভাবে কাউকে অপরাধী বানানো সহজ, কিন্তু সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর সেই অপবাদের ভার মুছে ফেলা অতটা সহজ নয়।”
আমাদের এই কঠিন সংকটে যারা পাশে ছিলেন, বিশেষ করে গাজীপুরের সিনিয়র সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ যারা আমাদের পক্ষে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
কলম কখনো মানুষকে হত্যা করে না, কলম কথা বলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ফুটিয়ে তোলে সত্যকে। অপবাদ দিয়ে সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, কিন্তু চিরতরে চাপা দেওয়া যায় না। সাংবাদিকের হাতে সবসময় কলম আর ল্যাপটপই শোভা পায়, কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়।
তবে যারা এই নোংরা কাজটি করেছিল তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভালো নেই, কেউ ভয়ে আগে থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে, বাকীরাও ‘‘গা ঢাকা দেয়ার পথে”। তবে এই মামলার বাদী বলেছেন, তাঁরা আমাদেরকে আসামি করেননি। স্বাধীনতা বিরোধী একটি ‘‘জঙ্গি গোষ্ঠী’’ পূর্বশত্রুতার জেরে এই মামলা করার সময় আমাদের নাম বসিয়ে দিয়ে আসামি করা হয়েছিল। সাবই ভালো থাকবেন।





