এম রানা, গাজীপুর:
গাজীপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক শক্তিশালী অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে ওঠার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অসাধু কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, বন্দিদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অর্থ আদায় এবং ক্যানটিনে কেনাকাটায় চরম অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ সিন্ডিকেটের কার্যক্রম চলছে।
কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একাধিক ভুক্তভোগী, কারাবন্দিদের স্বজন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের অনুসন্ধানে কারাগারে চলমান এই নৈরাজ্যের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে কারাগারের অভ্যন্তরে ক্যানটিন ও দোকানে খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটায় ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বাজারে স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও কাঁচামাল। ক্যানটিনে সাধারণ ৫ পিস পেঁয়াজের দাম ধরা হচ্ছে ৫০ টাকা। ২০০ মিলিগ্রামের আড়ং ডেইরি দুধের খুচরা মূল্য ৩০ টাকা হলেও ক্যানটিনে তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে ফোনালাপের ক্ষেত্রে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ১ টাকা প্রতি মিনিটে কথা বলার সুযোগ পাওয়ার কথা। তবে গাজীপুর জেলা কারাগারে প্রতি এক মিনিট কথা বলার জন্য কারারক্ষীরা বন্দিদের কাছ থেকে আদায় করছে ১০০ টাকা। এছাড়া বাইরে থেকে স্বজনরা বন্দিদের জন্য টাকা পাঠালে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা কেটে রেখে মাত্র ৮০০ টাকা পৌঁছানো হয়। বাকি টাকা চলে যায় এই সিন্ডিকেটের পকেটে।
কারাগারে থাকার ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা পেতেও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সাধারণ ওয়ার্ডে থাকার জন্য হাজতিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত সুবিধা ও আরামদায়ক ‘ভিআইপি’ বন্দিজীবন নিশ্চিত করতে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয় বলে জানা গেছে।
টাকা পরিশোধ করতে পারলে মেলে বিশেষ সুবিধা, আর অর্থ দিতে না পারা সাধারণ হাজতি ও বন্দিদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি, অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি বন্দি রাখার ফলে কারাগারে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত এক বন্দি জানান, অসৎ কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের যোগসাজশে অনৈতিকভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা টাকার বিনিময়ে কারাগারের ভেতরে সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি সেখান থেকেই বাইরে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।
অন্যদিকে, দুর্বল ও নতুন হাজতিদের ওপর চালানো হয় চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নতুন বন্দিদের প্রথম কয়েকদিন প্রয়োজনীয় পোশাক, কম্বল ও বিছানাও দেওয়া হয় না। কোনো অভিযোগ জানালে মিলছে না প্রতিকার, উল্টো টাকা দিলে মেলে কম্বল ও বিছানা।
স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও কারাগারটির অবস্থা করুণ। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় অসুস্থ বন্দিদের সময়মতো চিকিৎসা মেলে না। প্রায়ই জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা যায় এবং অসুস্থদের হাসপাতালে পাঠাতে চরম বিলম্ব করা হয়।
রান্নার মান অত্যন্ত নিম্নমানের ও অপরিচ্ছন্ন। অসহায় ও দরিদ্র বন্দিরা এই নিম্নমানের খাবার খেতে বাধ্য হলেও প্রভাবশালীরা ক্যানটিন থেকে কিনে খান। তা ছাড়া মশা, দুর্গন্ধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম অবহেলায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জেনারেটরের বিকট শব্দদূষণ এবং সার্বিক পরিবেশের কারণে অনেক বন্দি মারাত্মক মানসিক অবসাদসহ শ্বাসকষ্টজনিত জটিল রোগে ভুগছেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকেও তারা বঞ্চিত।
গাজীপুর জেলা কারাগারে এ ধরনের অনিয়ম ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হলেও কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো তদারকি বা প্রতিকার নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, এসব মিথ্যা আমি নতুন এসেছি, এ ধরণের অভিযোগ থাকলে আমাকে জানাবেন আমি দেখব। তবে এ ব্যাপারে কারা মহাপরিদর্শক (আইজিপ্রিজন) এর টিএনটি নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সরকারি ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়েছে।





